প্রকাশ : ... | ... | ...

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির চার নেতার নাম আলোচনায়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সংগৃহীত

আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। একাধিক নাম ঘুরলেও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। তবে রাষ্ট্রপতি পদে কার নাম চূড়ান্ত হবে, সেই সিদ্ধান্তের ভার দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপরই দিয়েছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ১ আগস্টের বৈঠকে এ বিষয়ে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে সম্ভাব্য চার প্রার্থীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বর্তমান দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে দলের ভেতরে নানা হিসাব চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, আলোচনায় থাকা চার নেতার প্রত্যেকেরই রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। তার মতে, তারা অভিজ্ঞ, উচ্চশিক্ষিত এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি তার বিবেচনায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, রাষ্ট্রের মর্যাদা দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে পারবেন—এমন ব্যক্তিত্বকেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক চিন্তা, আদর্শ ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে সহযোগিতা এবং জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। আলোচনায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নাম হিসেবে উঠে আসছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের ভেতরে ও বাইরে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন তিনি। বিশেষ করে গত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিএনপিতে প্রশংসিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন মির্জা ফখরুল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তিনবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে তার বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে এবং ১১ বার কারাবরণ করেছেন বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়। তারেক রহমান লন্ডনে এবং খালেদা জিয়া কারাগারে থাকার সময়ে দেশে বিএনপি ও আন্দোলনের দৃশ্যমান নেতৃত্বের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যও তার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও একাডেমিক ক্যারিয়ারও তাকে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় রেখেছে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি দলের প্রথম ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হন। পাঁচবার সংসদ-সদস্য এবং তিনবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তিনি। দলীয় সংকটের বিভিন্ন সময়ে বিএনপির সঙ্গে থাকার পাশাপাশি ওয়ান-ইলেভেনসহ বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে ছিলেন খন্দকার মোশাররফ। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। রাজনীতির বাইরে তার রয়েছে দীর্ঘ একাডেমিক জীবন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি, ১৯৭০ সালে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে আরেকটি ডিগ্রি, ১৯৭৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্বে পিএইচডি এবং ১৯৭৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে ডিআইসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরে অধ্যাপক হন এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভাগটির চেয়ারম্যান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। তবে বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থাও রাষ্ট্রপতি পদের বিবেচনায় একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। ড. আবদুল মঈন খানও আলোচনায় রয়েছেন তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, একাডেমিক যোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার পর ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার সংসদ-সদস্য এবং তিনবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ইংল্যান্ডে পিএইচডি গবেষণার সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন মঈন খান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বৃত্তি ও নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। পরে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তির সহায়তায় উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পান। বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনের সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায়ও মঈন খানের ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গনে সৎ ও সজ্জন হিসেবে পরিচিতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় তার নাম রয়েছে। চতুর্থ প্রার্থী হিসেবে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের অবস্থানও আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা এই নেতা মুক্তিযুদ্ধে বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধা। তিনি সামরিক কর্মকর্তা, ফিফা-স্বীকৃত ফুটবলার, সাতবারের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য এবং একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হাফিজ উদ্দিন ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং সর্বশেষ দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ছয় দশকের বেশি কর্মজীবনে সামরিক বাহিনী, রাজনীতি, ক্রীড়া ও জনপ্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ-সদস্য পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর মন্ত্রী এবং পরে সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন হাফিজ উদ্দিন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার কারণেই তাকে স্পিকার করা হয়েছিল বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নামও জোরালোভাবে বিবেচিত হচ্ছে। চার নেতার বাইরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আলোচনায় এলেও তিনি রাষ্ট্রপতি হতে আগ্রহী নন বলে জানা গেছে। সরকারের একটি সূত্রের দাবি, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খানের নামও এখন আর আলোচনায় নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট ভোট হওয়ার কথা। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে পারে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করেছিল। তিনি বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের কাছে ৮০ ভোটে হেরে যান। এরপর থেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এবারের সংসদীয় হিসাবও আলাদা। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২১১টি পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৬৮টি আসন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। দলের চার প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতার মধ্য থেকে কাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।