প্রকাশ : ... | ... | ...

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা, অনুতপ্ত নন অভিযুক্ত আমিনী


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে কারী ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। ফজলুল পেশায় মোটরসাইকেলচালক; পাশাপাশি মাঝে মাঝে ইমামতিও করেন বলে জানা গেছে। শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। অন্যদিকে, তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার তাকে হত্যার আহ্বান জানান। অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো ভিডিও বা তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানা গেছে। ঘটনার পর দেবহাটা থানার পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তখনো মামলা করা হয়নি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার নেতৃত্বে থাকা ফজলুল হক আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ফেসবুক লাইভে হত্যার শপথ গত ১০ অক্টোবরের আগে বা পরে নয়, ঘটনার আগে ফজলুল হক ফেসবুক লাইভে শামীমকে হত্যার শপথ নেওয়ার কথা বলেন। লাইভে তিনি বলেন, ‘ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবশ্যই দিতে হবে। আল্লাহ, রাসুল, সাহাবি ও কোরআনকে নিয়ে যে অবমাননাকর উক্তি করেছে, তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমি শপথ গ্রহণ করলাম, তাকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই দুনিয়া থেকে বিদায় করার জন্য আমি সংকল্পবদ্ধ।’ পরবর্তী একটি লাইভে তিনি জানান, শামীম বিষপানের পর কুলিয়া এলাকার সবুর নামের এক চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসাধীন। সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্য লোকজনকে আহ্বান জানিয়ে ফজলুল বলেন, শামীমকে চিকিৎসা দেওয়া কিংবা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। ওই ভিডিওতে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘অবশ্যই আমরা তাকে স্বহস্তে তার এই শাস্তি প্রদান করব, ঠিক কিনা? কোন ছাড় নাই!’ চিকিৎসকের চেম্বার থেকে হাসপাতালে হামলা শামীমের বড় ভাই জলিল সানা গণমাধ্যমকে জানান, তার ভাই ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা ও খুলনার বিভিন্ন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। সম্প্রতি খুলনার চিকিৎসক ধীরাজ মোহন বিশ্বাসের কাছেও চিকিৎসা নেওয়া হয়। জলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, শামীমের মানসিক অবস্থা সব সময় একই রকম থাকত না। কখনো স্বাভাবিক আচরণ করলেও কখনো অস্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেন। সম্প্রতি তার কিছু বক্তব্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। সোমবার দিবাগত রাতে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার পর স্থানীয় কয়েকজন শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করেন বলে জানান তার ভাই। অন্যদের হস্তক্ষেপে তখন পরিস্থিতি শান্ত হয়। ওই সময় শামীম বিষপান করলে পরদিন সকালে তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। জলিলের অভিযোগ, চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ফেসবুক লাইভ করার সময় ফজলুল হক ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সেখানে ঢুকে শামীমকে জোর করে বের করার চেষ্টা করেন এবং মারধর করেন। ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে শামীমকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে ফজলুল হকসহ অন্তত একজনকে তার বুকে জুতাসহ পা দিয়ে বারবার লাথি মারতে দেখা গেছে বলে বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শামীমকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। রাত ৯টার দিকে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বেশ কিছু মানুষ হাসপাতালে জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে শামীমকে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফজলুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, চিকিৎসকের চেম্বারে হামলার পর পুলিশ শামীমকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকজন তার চিকিৎসার বিরোধিতা করছিলেন। তাকে এমন জায়গায় নেওয়া হয়েছিল, যেখানে আগে থেকেই মানুষ উত্তেজিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেবহাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় শামীমকে পাওয়া যায় এবং সেখানেই তাকে মারধর করা হয়। মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট গণপিটুনিতে শামীমের মৃত্যুর পর ফজলুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট দেন। মঙ্গলবার রাত ১১টা ১১ মিনিটে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “মুরতাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম, কই মাছের জান তোর”। রাত ১২টা ৮ মিনিটে শামীমের মরদেহের ছবি দিয়ে আরেকটি পোস্টে লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মারা গেছেন, আল্লাহকে নিয়ে কটুক্তি, রাসুলকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, কোরআন কে নিয়ে অশালীন বক্তব্য প্রদানকারী অহিদুজ্জামান শামিম মুরতাদ মারা গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ”। গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ফজলুল হক জানান, এ ঘটনায় তিনি অনুতপ্ত নন এবং ভয়ও পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “আমি অনুতপ্ত হব? না না না, কোন অনুতপ্ত না আমি।” তিনি আরও বলেন, “আমাকে এরেস্ট করবে বিভিন্নভাবে ইয়ে চলতেছে সমস্যা কি, আমি আছি স্বাভাবিক আছি, কোন সমস্যা নেই। নিয়ে গেলে আমি সাথে সাথে লাব্বাইক বলে সাড়া দেব।” শামীমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, “না ওইভাবে যাচাই আমি করার সুযোগ হয়নি, তবে যারা আমার কাছে এগুলো ইনফরমেশনগুলো দিছে তারা ওর একেবারে নিকটতম মানুষ।” শামীমের পরিবার তার মানসিক অসুস্থতার কথা জানিয়েছে—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “যদি কোনোভাবে প্রমাণিত হয় সে আসলে অসুস্থ ছিল তাহলে তো ভিন্ন কথা। আমি অপরাধী। তার জন্য যে শাস্তি আছে অবশ্যই মাথা পেতে নেবো আমি।” তিনি আরও দাবি করেন, শামীমের বক্তব্য শুনে তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে মনে হয়নি। দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা মামলা করতে থানায় আসছেন। ফজলুল হক আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।