| ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের শিকলবাহা খালে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দ্বিতীয় বিয়ের সময় নিজের প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮) নামের ওই নারীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. মুসলিম উদ্দিন (৩৯) ও শুকুর আহম্মদ (২৪)। গত ১৩ অক্টোবর টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুকুর আহম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সাম্পান নৌকাটিও উদ্ধার করে জব্দ করা হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার মুসলিম উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। শুকুর আহম্মদকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত চলছে। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শিলকূপ ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। সাত বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যালের ব্যাপারীপাড়ায় ভাড়া বাসায় দ্বিতীয় স্বামী রাজা মিয়া ওরফে রাজুর সঙ্গে বসবাস করতেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন জান্নাতুল। বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিলেও পরে জান্নাতুল জানতে পারেন, তার স্বামীর প্রথম স্ত্রী রয়েছেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাজা মিয়া তার পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে তারা কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক ও তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। তাতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তারা হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর অপর পাড়ে ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে আগে থেকেই মুসলিম উদ্দিন, রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুকুর আহম্মদ এবং অজ্ঞাতনামা আরেক ব্যক্তি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। পরে জান্নাতুলকে নিয়ে তারা নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালে প্রবেশ করে। তদন্তে বলা হয়েছে, রাত ৮টার পর নৌকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে জান্নাতুলের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রাজা মিয়া তার মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন এবং জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন। এ সময় এক সহযোগী নৌকায় রাখা ব্যাগ থেকে রশি ও বস্তা বের করেন। রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে ধরার পর জান্নাতুলের মৃত্যু হয় বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। পরে জান্নাতুলের হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দি করা হয়। এরপর কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেডের পেছনের অংশে শিকলবাহা খালে মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা নৌকাটি নিয়ে ব্রিজঘাটে ফিরে যান এবং আত্মগোপনে চলে যান বলে পিবিআইয়ের তথ্য। গত ২ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের লঞ্চঘাটসংলগ্ন খালে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দি ও হাত-পা বাঁধা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে সদরঘাট নৌ-পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি জান্নাতুলের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ওরফে রাজু এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। গত ৬ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিট। পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেন। মামলায় রাজা মিয়া ওরফে রাজুর অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।